বাংলাদেশের উন্নয়ন এবং ইতিহাসের মাঝে কিছু স্থাপনা এমনভাবে চিহ্নিত হয়েছে, যা শুধুমাত্র প্রযুক্তিগত অর্জন নয়, দেশীয় সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যেও অবদান রেখেছে। পাবনা জেলার ঈশ্বরদী উপজেলার তিনটি স্থাপনা—পাকশী হার্ডিঞ্জ ব্রিজ, লালনশাহ সেতু এবং রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র—এগুলো শুধুমাত্র দেশের যাতায়াত ব্যবস্থাকে উন্নত করেছে এমন নয়, দেশের ইতিহাস, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির দিকেও এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
এক. পাকশী হার্ডিঞ্জ ব্রিজ
হার্ডিঞ্জ ব্রিজ বাংলাদেশের সবচেয়ে প্রাচীন এবং দীর্ঘতম রেল সেতু, যা পদ্মা নদী পাড়ি দিয়ে পাবনা জেলার পাকশী থেকে কুষ্টিয়া জেলার ভেড়ামারা উপজেলাকে সংযুক্ত করেছে। এটি ১৯০৯-১৯১৫ সালে নির্মিত হয় এবং সেতুটির উদ্বোধন করেন ভারতের তৎকালীন ভাইসরয় লর্ড হার্ডিঞ্জ। ব্রিজটির প্রকৌশল ও নির্মাণকে ইতিহাসের একটি মাইলফলক হিসেবে গণ্য করা হয়।
নির্মাণকাল ও প্রকল্পের পরিধি: পাকশী হার্ডিঞ্জ ব্রিজের নির্মাণ কাজ শুরু হয় ১৯০৯ সালে এবং ১৯১৫ সালে এটি সম্পূর্ণ হয়। এই সেতুর নির্মাণে ২৪,৪০০ শ্রমিক অংশগ্রহণ করেছিলেন। সেতুর নকশা প্রণয়ন করেছিলেন ব্রিটিশ প্রকৌশলী স্যার রবার্ট উইলিয়াম গেইলস এবং নির্মাণে রেইথ ওয়ালটি অ্যান্ড ক্রিক কোম্পানি অংশগ্রহণ করে।
প্রকল্পটির জন্য ব্রিটিশ সরকারের পক্ষ থেকে প্রায় ৫৫ লাখ টাকা ব্যয় করা হয়েছিল, যা তখনকার সময়ের জন্য বিপুল পরিমাণ অর্থ ছিল। সেতুর মোট দৈর্ঘ্য ১,৭৯৮.৩২ মিটার (৫৮৯৪ ফুট), এবং এর ১৫টি স্প্যান রয়েছে।
বিশেষ বৈশিষ্ট্য: সেতুর উপরের অংশের ধরণ ছিল আর্চ রেইল ব্রিজ, যা উঁচু স্থানে নির্মাণ করা হয়েছিল যাতে নদীটির নৌপথের বাধা না হয়। সেতুর ভিত্তি স্থাপন করা হয়েছিল ১৬০ ফুট গভীরে, যা সেই সময়ের প্রযুক্তিতে একটি চ্যালেঞ্জ ছিল। ব্রিজটির চারপাশে ১৫টি প্রধান স্প্যান ও অনেক ছোট স্প্যান রয়েছে। সেতুর নির্মাণকালীন সময়ে যাত্রীরা প্রায় প্রতিদিন ট্রেন ব্যবহার করতেন, যা স্থানীয় অর্থনীতির জন্যও গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময়: ১৯৭১ সালে পাকশী হার্ডিঞ্জ ব্রিজটি পাকিস্তানি বাহিনীর আক্রমণের শিকার হয়। ৩ ডিসেম্বর ১৯৭১ তারিখে পাক বাহিনী একটি ট্রেন বোমা হামলা চালায়, যার ফলে সেতুর ১২ নম্বর স্প্যানটি ধ্বংস হয়ে যায়। তবে স্বাধীনতার পর সেতুর সংস্কার কাজ শুরু হয় এবং পুনরায় যান চলাচল শুরুর মধ্য দিয়ে এটির গুরুত্ব পুনরায় প্রমাণিত হয়।
দুই. লালনশাহ সেতু
লালনশাহ সেতু কুষ্টিয়া জেলার সুলতানপুর এবং মেহেরপুর জেলার চরগাছা ও পুঠিয়া উপজেলার মধ্যে পদ্মা নদী পাড়ি দেওয়ার জন্য নির্মিত একটি আধুনিক সেতু। এই সেতুর নামকরণ করা হয়েছে বাউল সম্রাট লালন শাহের নামে, যিনি কুষ্টিয়ার গৌরবময় একটি সংস্কৃতির ধারক।
নির্মাণকাল ও প্রকল্পের পরিধি: লালনশাহ সেতুর নির্মাণ কাজ শুরু হয়েছিল ২০০৩ সালে এবং ২০০৪ সালে এটি যান চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করা হয়। এটি দেশের বৃহত্তম সেতু প্রকল্পগুলোর একটি ছিল এবং প্রাথমিকভাবে ১.৮ কিলোমিটার দৈর্ঘ্য ছিল। সেতুর নির্মাণে প্রায় ৩,৫০০ কোটি টাকা খরচ হয়েছিল।
এই সেতুটি তৈরি হয়েছে নদীটির চলাচলকে উন্নত করার উদ্দেশ্যে এবং দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জনগণের জন্য যোগাযোগ ব্যবস্থাকে সহজতর করেছে।
বিশেষ বৈশিষ্ট্য: সেতুর দৈর্ঘ্য ১.৮ কিলোমিটার এবং প্রস্থ ১৮.১০ মিটার। এটি চারটি লেনের সেতু, যা মেহেরপুর, কুষ্টিয়া, চুয়াডাঙ্গা এবং ঝিনাইদহ অঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থাকে অত্যন্ত উন্নত করেছে। সেতুর নির্মাণে যেসব প্রযুক্তি ব্যবহৃত হয়েছে, তা অত্যন্ত আধুনিক এবং সেতুর নিরাপত্তা ব্যবস্থাও শক্তিশালী।সেতুটি এখন স্থানীয় পর্যটকদের জন্য একটি আকর্ষণীয় স্থানে রূপ নিয়েছে। এই সেতুর উপর দাঁড়িয়েই দিনে এবং রাতে মানুষ এই তিনটি স্থাপনা উপভোগ করে।
তিন. রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র বাংলাদেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র, যা পাবনা জেলার ঈশ্বরদী উপজেলার রূপপুরে অবস্থিত। এটি বাংলাদেশের শক্তির ভবিষ্যৎ এবং দেশের বিদ্যুৎ চাহিদা পূরণে একটি গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে।
নির্মাণ ও প্রকল্পের ইতিহাস: রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের নির্মাণ কাজ শুরু হয় ২০১০ সালে, যখন বাংলাদেশ সরকার রাশিয়ার সাথে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করে। এটি রাশিয়ার রোসাটোম স্টেট অ্যাটমিক এনার্জি কর্পোরেশনের সহযোগিতায় নির্মিত হচ্ছে।
প্রথম ইউনিটের কাজ শুরু করে ২০২৪ সালে এবং পরবর্তী ইউনিটগুলো পর্যায়ক্রমে চালু হবে।
বিশেষ বৈশিষ্ট্য: রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রটির প্রথম ইউনিটটি ১,২০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার হবে এবং এটি পুরো জাতির বিদ্যুৎ চাহিদার একটি বড় অংশ পূরণ করবে। বিদ্যুৎ কেন্দ্রটিতে ব্যবহৃত প্রযুক্তি অত্যন্ত নিরাপদ এবং আধুনিক, যেখানে পাঁচটি স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা রয়েছে। এই কেন্দ্রটি বাংলাদেশের শক্তি উৎপাদনে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনবে এবং দেশের বিদ্যুৎ খাতের নির্ভরযোগ্যতা বাড়াবে।
অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত দৃষ্টিকোণ: রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের নির্মাণ বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতে একটি যুগান্তকারী পরিবর্তন আনবে। দেশের বিদ্যুৎ চাহিদা পূরণে নতুন সুযোগ সৃষ্টি হবে, বিশেষ করে শিল্প খাতের জন্য। একই সাথে, এই প্রকল্পটি পরিবেশের ওপর ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে, কারণ এটি তুলনামূলকভাবে কম কার্বন নিঃসরণ করবে।
এই তিনটি স্থাপনা—পাকশী হার্ডিঞ্জ ব্রিজ, লালনশাহ সেতু এবং রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র—বাংলাদেশের প্রযুক্তিগত, ঐতিহাসিক এবং সামাজিক অবদানকে দৃঢ়ভাবে প্রতিফলিত করে। এসব স্থাপনা বাংলাদেশের প্রগতির প্রতীক এবং এগুলি দেশীয় জনগণের জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনবে।
