জীবনের ৭৫টি বছর পেরিয়েও যিনি এখনো থেমে যাননি—তিনি পাবনার প্রবীণ আইনজীবী সহকারী (মহুরী) মো. আবদুল হাই। দীর্ঘ ৫৭ বছর ধরে পাবনার আদালতে মহুরী হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছেন এই শিক্ষানুরাগী মানুষটি। কিন্তু তাঁর স্বপ্ন একটাই—নিজ হাতে আইনজীবীর পোশাক পড়ে একদিন হলেও আদালতে দাঁড়ানো।
১৯৬৮ সালে আইনজীবীর মহুরী হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন আবদুল হাই। একই বছর ম্যাট্রিক পরীক্ষা দিলেও পাশ করেন চার বছর পর, ১৯৭২ সালে। সংসার-জীবনে প্রবেশের পরেও পড়াশোনার আগ্রহ হারাননি তিনি। দীর্ঘ ৩৪ বছর পর, ২০০৬ সালে নিজের কন্যার সঙ্গে এইচএসসি পাস করেন। এরপর ২০১০ সালে উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিএ ডিগ্রি অর্জন করেন।
নিজের শিক্ষার পথচলা এগিয়ে নিয়ে ২০১২ সালে তিনি পাবনা আইন কলেজে এলএলবি কোর্সে ভর্তি হন। আট বছর অধ্যয়নের পর ২০২০ সালে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। সর্বশেষ, ২০২৫ সালের ২৫ এপ্রিল বার কাউন্সিলের আইনজীবী তালিকাভুক্তির (এনরোলমেন্ট) পরীক্ষায় অংশ নেন তিনি, যদিও প্রথমবারে উত্তীর্ণ হতে পারেননি।
পাবনা সদর উপজেলার দোগাছি ইউনিয়নের কুলুনিয়া গ্রামের বাসিন্দা আবদুল হাই পাঁচ ভাইবোনের মধ্যে তৃতীয়। তাঁর বাবা মরহুম আব্দুর রহমান মিয়া ছিলেন একজন ইমাম। স্থানীয়দের মতে, আবদুল হাই একজন পরিশ্রমী ও সৎ মানুষ। নিজেই চাষাবাদ করেন, সময় কাটান জমিতে। অপ্রয়োজনীয় আড্ডা পরিহার করেন এবং সময়কে কাজে লাগাতে ভালোবাসেন।
স্ত্রী মোছা. রওশন আরা জানান, ১৭ মে তাঁদের বিবাহিত জীবনের ৫০ বছর পূর্ণ হতে যাচ্ছে। এই দিনটিকে বিশেষভাবে উদযাপনের ইচ্ছা তাঁদের রয়েছে। তিনি বলেন, “স্বামীর শিক্ষার প্রতি আগ্রহ দেখে আমি সবসময় তাকে উৎসাহ দিয়েছি। এখন যদি সে উকিল হতে পারে, সেটা আমাদের জন্য গর্বের হবে।”
ছোট মেয়ে সকিনা পারভীন, যিনি শহীদ এম মনসুর আলী উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা, বলেন, “বাবার সঙ্গে একসাথে এইচএসসি দিয়েছি। তিনি আমার সাথী ছিলেন, আমি তার। তাঁর কাছ থেকেই আমি শিখেছি জীবনে হার না মানার মানসিকতা।”
বড় মেয়ে হাসিনা পারভীন জানান, “বাবার সবচেয়ে বড় স্বপ্ন একদিন উকিলের পোশাক পরা। অন্তত একদিনের জন্য হলেও তিনি সেটা করে যেতে চান।”
জেলা আইনজীবী সহকারী সমিতির সভাপতি কাজী আইয়ুব আলী বলেন, “আমি বার কাউন্সিলের প্রতি অনুরোধ জানাই, আবদুল হাই সাহেবের এই আজীবনের ইচ্ছাটিকে যেন গুরুত্ব দিয়ে দেখা হয়।”
জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি আলহাজ আবুল কালাম আজাদ বাচ্চু বলেন, “আমার বিশ্বাস, তিনি আগামীবারের পরীক্ষায় সফল হবেন।”
৭৫ বছর বয়সী এই তরুণ বলেন, “উকিলের পোশাক অন্তত একবার পড়ে পৃথিবী থেকে বিদায় নিতে চাই।”
