পাবনার আটঘরিয়া উপজেলার একদন্ত ইউনিয়নের গুরুবাসী গ্রামে ঢুকতেই চোখে পড়ে সারি সারি খেজুরগাছ। গাছের ডালে ঝুলছে থোকা থোকা ফল। দৃশ্যটি দেখে অনেকেরই মনে হতে পারে, যেন দেশের কোনো গ্রামে নয়, মধ্যপ্রাচ্যের কোনো খেজুরবাগানে এসে পড়েছেন। তবে এটি কোনো বিদেশি খামার নয়; স্থানীয় কৃষক সাইফুল ইসলাম হিরোর যত্নে গড়ে ওঠা একটি বিদেশি জাতের খেজুরবাগান।
প্রচলিত কৃষির বাইরে নতুন কিছু করার ইচ্ছা থেকেই ২০২২ সালে বিদেশি খেজুর চাষ শুরু করেন সাইফুল ইসলাম হিরো। গয়েশপুর এলাকার রাজিবের কাছ থেকে কয়েকটি উন্নত জাতের চারা সংগ্রহ করে ৩৩ শতাংশ জমিতে মাত্র চারটি গাছ লাগিয়েছিলেন তিনি। শুরুতে অনেকেই তার উদ্যোগ নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছিলেন। অনেকে বলেছিলেন, বাংলাদেশের আবহাওয়ায় বিদেশি খেজুরের ফলন সম্ভব নয়।
সেই সংশয়কে চ্যালেঞ্জ করেই নিয়মিত পরিচর্যা, বিভিন্ন উৎস থেকে তথ্য সংগ্রহ এবং বাস্তব অভিজ্ঞতার সমন্বয়ে এগিয়ে যান তিনি। চারটি গাছ দিয়ে শুরু হওয়া সেই উদ্যোগ এখন প্রায় ৬০টি গাছের একটি বাগানে পরিণত হয়েছে।
বাগানটিতে সৌদি আরব ও মধ্যপ্রাচ্যের জনপ্রিয় ১০ থেকে ১২টি জাতের খেজুর রয়েছে। এর মধ্যে আজওয়া, মরিয়ম, মেজুল, ছুক্কারি, ওয়ারহিছ ও বড়ই জাত উল্লেখযোগ্য। বিভিন্ন জাতের গাছের বৃদ্ধি ও ফলনের ধরনও ভিন্ন। কিছু গাছে ইতোমধ্যে ভালো ফলন এসেছে, আবার কিছু গাছ থেকে উন্নতমানের সাকার উৎপন্ন হচ্ছে, যা ভবিষ্যতে নতুন বাগান সম্প্রসারণে কাজে লাগানো যাবে।
বর্তমানে বাগানটিতে প্রতিদিনই বিভিন্ন এলাকা থেকে কৃষক, শিক্ষার্থী, উদ্যোক্তা ও কৌতূহলী মানুষ আসছেন। কেউ বিদেশি খেজুর চাষ সম্পর্কে জানতে চান, কেউ আবার নিজেদের জমিতে একই ধরনের বাগান করার পরিকল্পনা নিয়ে পরামর্শ নিচ্ছেন।
কৃষক সাইফুল ইসলাম হিরো বলেন, “শুরুতে অনেকেই নিরুৎসাহিত করেছিলেন। কিন্তু আমি ধৈর্য হারাইনি। নিয়মিত পরিচর্যা করেছি, বিদেশি খেজুর চাষ নিয়ে পড়াশোনা করেছি এবং অভিজ্ঞদের সঙ্গে যোগাযোগ রেখেছি। এখন গাছে ফল এসেছে। মানুষ বাগান দেখতে আসে, পরামর্শ নেয়। ভবিষ্যতে আরও বড় পরিসরে এই চাষ সম্প্রসারণ করতে চাই।”
তিনি জানান, বিদেশি খেজুর চাষে উন্নতমানের সাকার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তার বাগানের অনেক গাছে এখন সাকার উৎপন্ন হচ্ছে। এসব সাকার থেকে নতুন চারা তৈরি করা সম্ভব হবে। বর্তমানে মরিয়ম জাতের একটি চারার বাজারমূল্য প্রায় ১ হাজার ৭০০ থেকে ১ হাজার ৮০০ টাকা।
একদন্ত ব্লকের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা মিলি বলেন, বিদেশি খেজুর চাষে কৃষকদের আগ্রহ বাড়ছে। কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে নিয়মিত কারিগরি পরামর্শ ও মাঠপর্যায়ে সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। সঠিক পরিচর্যা নিশ্চিত করা গেলে এ চাষ লাভজনক হতে পারে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মাহমুদা মোতমাইন্না বলেন, আটঘরিয়ার মাটি ও জলবায়ু উন্নত জাতের বিদেশি খেজুর চাষের জন্য সম্ভাবনাময়। সাইফুল ইসলাম হিরোর মতো উদ্যোক্তারা নতুন কৃষকদের উৎসাহিত করছেন। কৃষি বিভাগ এ ধরনের উদ্যোগে প্রয়োজনীয় কারিগরি সহায়তা দিয়ে যাচ্ছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, কয়েক বছর আগেও এলাকায় বিদেশি খেজুর চাষের কথা খুব একটা শোনা যেত না। এখন বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা থেকে মানুষ এই বাগান দেখতে আসছেন। অনেকে সাকার ও চারা সংগ্রহের আগ্রহও প্রকাশ করছেন।
কৃষি সংশ্লিষ্টদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের বাস্তবতায় উচ্চমূল্যের ফল চাষ কৃষকের আয় বাড়ানোর একটি সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র। পরিকল্পিতভাবে বিদেশি খেজুর চাষ সম্প্রসারণ করা গেলে দেশের ফল উৎপাদনে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। আটঘরিয়ার এই বাগান সেই সম্ভাবনারই একটি বাস্তব উদাহরণ হয়ে উঠছে।
