ঢাকাবুধবার , ২২ অক্টোবর ২০২৫
আজকের সর্বশেষ সবখবর

এক যুগে সড়কে প্রাণহানি এক লাখ ১৬ হাজার

জুবায়ের খান প্রিন্স, পাবনা:
অক্টোবর ২২, ২০২৫ ৫:০৪ অপরাহ্ণ
Link Copied!

শেয়ার করুন...

বাংলাদেশের সড়কে চলমান প্রাণহানির চিত্র ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। গত ১২ বছরে (২০১৪ থেকে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত) দেশে ৬৭ হাজার ৮৯০টি দুর্ঘটনায় এক লাখ ১৬ হাজার ৭২৬ জন নিহত এবং এক লাখ ৬৫ হাজার ২১ জন আহত হয়েছেন।
এই পরিসংখ্যান প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি, যারা সড়কে এই বিপুল প্রাণহানিকে ‘গণহত্যা’ হিসেবে বর্ণনা করেছে।

সংগঠনটির মতে, শুধু বাংলাদেশেই সড়ক দুর্ঘটনায় নিহতের সংখ্যা ইসরায়েল-ফিলিস্তিন ও ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের মোট প্রাণহানির চেয়েও বেশি। তাদের দাবি, যুদ্ধ নয়—বাংলাদেশের সড়কই এখন মৃত্যু ফাঁদে পরিণত হয়েছে।

জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস-২০২৫ উপলক্ষে মঙ্গলবার (২১ অক্টোবর) ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে সমিতির মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী এই তথ্য তুলে ধরেন।

তিনি বলেন, “পরিবহন খাতের দীর্ঘদিনের অনিয়ম, দুর্নীতি, মালিক-শ্রমিকের চাঁদাবাজি, প্রশাসনের অদক্ষতা এবং ফিটনেসবিহীন যানবাহন চলাচলএসবের সম্মিলিত ফলেই সড়কে মৃত্যু প্রতিদিনের ঘটনায় পরিণত হয়েছে।”

দুর্নীতির শেকড়ে বিপর্যয়:

মোজাম্মেল হক জানান, স্বাধীনতার আগে দেশের প্রায় ৮০ শতাংশ মানুষ যাতায়াত করত নৌ ও রেলপথে। কিন্তু স্বাধীনতার পর দাতা সংস্থার প্রেসক্রিপশননির্ভর উন্নয়ন নীতিতে নৌ ও রেল পরিবহন উপেক্ষিত থেকে সড়কনির্ভরতা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮০ শতাংশে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বেপরোয়া মোটরসাইকেল, ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা ও লাইসেন্সবিহীন চালকের আধিক্য।

তার দাবি, “পরিবহন খাতে জবাবদিহির অনুপস্থিতি এবং নীতিনির্ধারণে অদক্ষতার কারণে সড়ক এখন যেন মৃত্যুর রাজপথে পরিণত হয়েছে। মন্ত্রণালয় ও নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর নীতি পরিবর্তনের কোনো পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে না।”

পাবনায় দুর্ঘটনার বেড়াজাল:

পাবনা জেলায়ও সড়ক দুর্ঘটনার প্রবণতা বাড়ছে। জেলা পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত অন্তত ৩৭টি দুর্ঘটনায় ৫২ জন নিহত হয়েছেন, আহত হয়েছেন শতাধিক মানুষ।
পাবনা-ঢাকা মহাসড়ক, আটঘরিয়া ও বেড়া অঞ্চলে অতিরিক্ত গতি, রাতের বেপরোয়া ড্রাইভিং এবং ব্যাটারিচালিত যানবাহনের অনিয়ন্ত্রিত চলাচল দুর্ঘটনার প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।

গণপরিবহন ব্যবস্থায় সংস্কারের দাবি:

মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, “বাংলাদেশে সড়ক পরিবহন খাত এখন পুরোপুরি মালিক-শ্রমিক ও দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের নিয়ন্ত্রণে। এসব বন্ধে সেক্টর সংস্কারের বিকল্প নেই।”

তিনি আরও সতর্ক করেন, “ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা নিবন্ধনের উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে অদূর ভবিষ্যতে ঢাকা ও চট্টগ্রামের সড়ক অচল হয়ে পড়বে।”

১২ দফা প্রস্তাবনা:

সংগঠনটি সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণ ও গণপরিবহনে শৃঙ্খলা আনতে ১২ দফা প্রস্তাব দিয়েছে—

১. নৌ ও রেলপথের সমন্বয়ে জাতীয় পরিবহন নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা। ২. পরিবহন খাতের চাঁদাবাজি, দুর্নীতি ও রাজনৈতিক দখলদারিত্বের অবসান।
৩. বিভাগীয় শহরগুলোতে ম্যাস ট্রানজিট (পাতাল মেট্রোরেল) ব্যবস্থা চালু। ৪. ডিজিটাল পেমেন্টভিত্তিক বাস র‌্যাপিড ট্রানজিট লেন স্থাপন।
৫. জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে উন্নতমানের বাস সার্ভিস সম্প্রসারণ। ৬. অটোরিকশা, নসিমন-করিমন ও অপ্রমিত যান আমদানি নিয়ন্ত্রণ।
৭. রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে চালকদের প্রশিক্ষণ ও সার্টিফিকেশন নিশ্চিত করা। ৮. ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় ডিজিটাল প্রযুক্তি ও প্রশিক্ষণ একাডেমি স্থাপন।
৯. সড়ক দুর্ঘটনার প্রতিটি মামলা সরকারি পক্ষ থেকে তদন্ত ও ক্ষতিপূরণ ব্যবস্থা। ১০. নীতিনির্ধারণে যাত্রী প্রতিনিধি অন্তর্ভুক্তকরণ।
১১. সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তাদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা। ১২. পথচারী ও সাইক্লিস্টদের জন্য আলাদা লেন ও নিরাপদ ফুটপাত নির্মাণ।

শেষ কথা

মোজাম্মেল হক বলেন, “সড়ক শুধু উন্নয়নের প্রতীক নয়, এটি মানুষের জীবনের নিরাপত্তার সঙ্গে সম্পর্কিত। পরিবহন ব্যবস্থায় জবাবদিহিতা না আনলে এই মৃত্যুর মিছিল থামানো যাবে না।”

সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন সংগঠনের সভাপতি শরীফ রফিকুজ্জামান, বারভিডার সভাপতি আবদুল হক, ড্রাইভার্স ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান বাদল আহমেদ প্রমুখ।


শেয়ার করুন...

বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।
error: Content is protected !!