ঢাকাবৃহস্পতিবার , ৯ জুলাই ২০২৬
আজকের সর্বশেষ সবখবর

চলনবিলে পানি বাড়তেই নৌকা তৈরিতে ব্যস্ত কারিগর, জমে উঠেছে বেচাকেনা

মোতাহারুল ইসলাম, বার্তা সম্পাদক:
জুলাই ৯, ২০২৬ ১২:৫৬ অপরাহ্ণ
Link Copied!

শেয়ার করুন...

বর্ষার শুরুতেই চলনবিল অধ্যুষিত নাটোরের সিংড়া উপজেলার নিম্নাঞ্চলে বন্যার পানি প্রবেশ করতে শুরু করেছে। প্রতিদিনই বাড়ছে পানি। এর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে জমে উঠেছে নৌকা তৈরির কাজ। নতুন নৌকা নির্মাণের পাশাপাশি পুরনো নৌকা মেরামতেও ব্যস্ত সময় পার করছেন কারিগররা।

সিংড়া উপজেলার চলনবিল ও আত্রাই নদীকেন্দ্রিক জনপদে বর্ষাকালে নৌকাই হয়ে ওঠে মানুষের প্রধান যাতায়াতের মাধ্যম। আষাঢ়-শ্রাবণ থেকে কার্তিক মাস পর্যন্ত প্রায় পাঁচ মাস বিস্তীর্ণ এলাকা জলমগ্ন থাকায় গ্রামগুলোর সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। তখন এক গ্রাম থেকে অন্য গ্রামে যাতায়াত, হাটবাজারে যাওয়া এবং মাছ ধরাসহ নানা কাজে নৌকার ওপরই নির্ভর করতে হয় স্থানীয়দের।

সরেজমিনে উপজেলার বিলদহর, কালিনগর, শেরকোল, তাজপুর, সাঁতপুকুরিয়া, বড়িয়া, ডাহিয়া, বিয়াশ ও পৌর এলাকার বিভিন্ন স্থানে গিয়ে দেখা যায়, কারিগররা দিনরাত পরিশ্রম করে নতুন নৌকা তৈরি করছেন। একই সঙ্গে অনেকেই পুরনো নৌকায় আলকাতরা লাগানো, তক্তা জোড়া দেওয়া ও বিভিন্ন অংশ মেরামতের কাজ করছেন।

বর্ষা মৌসুমকে সামনে রেখে জেলেরাও মাছ ধরার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। ফলে ছোট ডিঙি নৌকাসহ বিভিন্ন ধরনের নৌকার চাহিদা বেড়েছে। এ কারণে নৌকা তৈরির কারখানাগুলোতে এখন অর্ডারের চাপও বেড়েছে।

পৌর শহরের বালুয়া বাসুয়া এলাকার এক কাঠমিস্ত্রী জানান, সারা বছর কাঠের বিভিন্ন আসবাব তৈরির কাজ করলেও বর্ষা এলেই নৌকা তৈরির কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। এই মৌসুমের অতিরিক্ত আয়ই তার পরিবারের জন্য বাড়তি সহায়তা হয়ে ওঠে।

চকসিংড়া মহল্লার নৌকা তৈরির কারখানার মালিক আব্দুল হান্নান বলেন, “আমাদের কারখানায় কড়ই, হিজল ও মেহগনি কাঠ দিয়ে বেশিরভাগ নৌকা তৈরি করা হয়। এছাড়া আলকাতরা, বাঁশ, তারকাঁটা ও অন্যান্য উপকরণ ব্যবহার করা হয়। এ বছর এখন পর্যন্ত প্রায় ৬০টি নতুন নৌকা বিক্রি করেছি। মৌসুম শেষে ২০০ থেকে ২৫০টি নৌকা বিক্রির আশা করছি। বর্তমানে কাঠের ডিঙি নৌকা সাড়ে ৫ হাজার থেকে ৬ হাজার টাকা এবং প্লেন সিটের নৌকা সাড়ে ৮ হাজার থেকে ৯ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে।”

নৌকা তৈরির কারিগর স্বপন চন্দ্র সূত্রধর বলেন, “বর্ষার সময়ে প্রতিদিন দুই থেকে তিনটি নৌকা তৈরি করি। নৌকার ধরন অনুযায়ী এক হাজার থেকে এক হাজার ৮০০ টাকা পর্যন্ত মজুরি পাই। বছরের বাকি সময়ে কাঠমিস্ত্রীর কাজ করেই সংসার চালাই।”

সাঁতপুকুরিয়া গ্রামের ক্রেতা মো. রুবেল হোসেন বলেন, “আমাদের গ্রামটি চলনবিলের মাঝখানে। সামান্য বৃষ্টিতেই রাস্তাঘাট পানিতে তলিয়ে যায়। বর্ষায় নৌকাই একমাত্র ভরসা। তাই নৌকা কিনতে এসেছি। তবে এবার দাম আগের তুলনায় অনেক বেশি।”

চামারী ইউনিয়নের আনন্দনগর এলাকার আফজাল হোসেন বলেন, “চলনবিলে পানি বাড়লেই নৌকার প্রয়োজন হয়। মাছ ধরা, জমিতে যাওয়া কিংবা এক বাড়ি থেকে অন্য বাড়িতে যেতে নৌকা ছাড়া উপায় নেই। তাই নতুন নৌকা কিনতে এসেছি।”

নৌকা তৈরির কারখানার মালিক গোদা কুমার বলেন, কাঠ, লোহা ও অন্যান্য উপকরণের দাম বাড়ায় গত বছরের তুলনায় উৎপাদন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।

কারিগর আব্দুল কুদ্দুস বলেন, “সারা বছর তেমন কাজ থাকে না। কিন্তু বর্ষা এলেই ব্যস্ততা শুরু হয়। এখন প্রতিদিনই নতুন নৌকার অর্ডার পাচ্ছি। কাঠের দাম বাড়লেও প্রয়োজনের কারণে মানুষ নৌকা কিনছেন। ফলে কাজের চাপ কয়েকগুণ বেড়ে গেছে।”

নৌকা নির্মাতাদের আশা, বর্ষা যত এগোবে এবং চলনবিলে পানি বাড়বে, ততই নৌকার চাহিদা ও বিক্রি আরও বৃদ্ধি পাবে।


শেয়ার করুন...

বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।
error: Content is protected !!