টানা কয়েক দিনের ভারী বর্ষণ, দেশের বিভিন্ন এলাকায় বন্যা ও সরবরাহ সংকটের প্রভাবে পাবনার ঈশ্বরদীতে অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে কাঁচা মরিচের দাম। মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে প্রতি কেজি কাঁচামরিচের দাম ৪০-৫০ টাকা থেকে বেড়ে ১০০-১২০ টাকায় পৌঁছেছে। আর পাড়া-মহল্লায় ভ্রাম্যমাণ বিক্রেতাদের কাছ থেকে কিনতে হলে গুনতে হচ্ছে ১৪০ টাকা পর্যন্ত। কাঁচামরিচের পাশাপাশি প্রায় সব ধরনের সবজির দামও বেড়েছে কেজিতে ১০ থেকে ১৫ টাকা। এতে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন দিনমজুর, রিকশাচালক, নিম্ন আয়ের চাকরিজীবী ও স্বল্প আয়ের পরিবারগুলো।
সোমবার (১৩ জুলাই) সকালে ঈশ্বরদী পৌর দৈনিক সবজি বাজার, স্টেশন বাজার ও আশপাশের কয়েকটি খুচরা বাজার ঘুরে দেখা যায়, প্রতিটি দোকানেই কাঁচামরিচের দাম ১০০ থেকে ১২০ টাকা কেজি। অন্যদিকে ভ্রাম্যমাণ বিক্রেতারা একই মরিচ বিক্রি করছেন ১৩০ থেকে ১৪০ টাকা কেজি দরে বাজারে আসা ক্রেতাদের অনেকেই প্রয়োজনের তুলনায় কম পরিমাণ মরিচ কিনে ফিরে যাচ্ছেন।
বাজারে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত সপ্তাহেও যে কাঁচামরিচ ৪০ থেকে ৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয়েছে, তা কয়েক দিনের ব্যবধানে দ্বিগুণেরও বেশি বেড়ে যায়। পাইকারি বাজারে দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে খুচরা বাজারেও এর প্রভাব পড়েছে। ব্যবসায়ীদের দাবি, স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত কাঁচামরিচের বড় একটি অংশ এখন দেশের বন্যাকবলিত দক্ষিণাঞ্চল ও ঢাকার বাজারে চলে যাওয়ায় স্থানীয় বাজারে সরবরাহ কমে গেছে। ফলে চাহিদার তুলনায় পণ্য কম থাকায় দাম বাড়ছে।
শুধু কাঁচামরিচ নয়, অন্যান্য সবজির বাজারেও ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা গেছে বর্তমানে বেগুন বিক্রি হচ্ছে ৬০ টাকা কেজি, যা এক সপ্তাহ আগে ছিল ৫০ টাকা। কচু ৪০ টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ৫০ টাকা, পটল ২০ টাকা থেকে ২৫ টাকা, ঝিঙে ২০ টাকা থেকে ৩০ টাকা, করলা ৩০ টাকা থেকে ৪০ টাকা এবং ঢেঁড়স ২৫ টাকা থেকে ৩০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। তবে আলু ও পেঁয়াজের বাজারে আপাতত বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা যায়নি।
ঈশ্বরদী বাজারের পাইকারি কাঁচামরিচ ব্যবসায়ী আওলাদ হোসেন বলেন,‘কয়েক দিনের টানা বৃষ্টিতে দেশের দক্ষিণাঞ্চলের অনেক এলাকা বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে। ওইসব এলাকায় স্থানীয় উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় উত্তরাঞ্চলের কাঁচামরিচের চাহিদা হঠাৎ বেড়ে গেছে। ঢাকাসহ দক্ষিণাঞ্চলের বড় বাজারে বেশি পরিমাণ মরিচ পাঠানো হচ্ছে। ফলে স্থানীয় বাজারে সরবরাহ কমে গেছে। চাহিদা বাড়লে দামও বাড়ে। এক সপ্তাহ আগে যে মরিচ ৪০-৫০ টাকায় বিক্রি করেছি, এখন সেটি ১০০ থেকে ১১০ টাকায় বিক্রি করতে হচ্ছে।’
পৌর দৈনিক সবজি বাজারের খুচরা বিক্রেতা মিনারুল ইসলাম বলেন, ‘আমরাও বেশি দামে কিনছি। পাইকারি বাজারেই প্রতি কেজি মরিচের দাম ১০০ থেকে ১১০ টাকা। পরিবহন খরচ ও অন্যান্য ব্যয় যোগ করে খুচরা বাজারে ১২০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি করতে হচ্ছে। দাম বাড়িয়ে বিক্রি করার ইচ্ছা আমাদের নেই, কিন্তু বেশি দামে কিনলে কম দামে বিক্রি করা সম্ভব নয়।’
ভ্রাম্যমাণ সবজি বিক্রেতা সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘গতকাল ১২০ টাকা কেজি দরে বিক্রি করেছি। আজ ১৪০ টাকা কেজি বিক্রি করছি। কারণ আজ পাইকারি বাজার থেকেই প্রতি কেজি ১১০ টাকা দিয়ে কিনতে হয়েছে। লাভের পরিমাণ আগের মতোই আছে, শুধু কেনার দাম বেড়েছে।’
বাজারে কেনাকাটা করতে আসা রিকশাচালক আলী হোসেন বলেন, ‘কয়েক দিনের বৃষ্টিতে ঠিকমতো রিকশা চালাতে পারছি না। আয় কমে গেছে। এর মধ্যে বাজারে এসে দেখি সবকিছুর দাম বেড়েছে। সবচেয়ে বেশি বেড়েছে কাঁচামরিচের দাম। এক পোয়া মরিচ কিনতেই ৩০ টাকা লেগেছে। সংসার চালানো এখন খুব কঠিন হয়ে গেছে।’
গৃহিণী ও অন্যান্য ক্রেতারাও জানান, রান্নাঘরের নিত্যপ্রয়োজনীয় উপকরণের দাম একসঙ্গে বেড়ে যাওয়ায় দৈনন্দিন খরচের হিসাব এলোমেলো হয়ে গেছে। অনেকেই প্রয়োজনের তুলনায় কম পরিমাণ সবজি ও কাঁচামরিচ কিনতে বাধ্য হচ্ছেন।
এ বিষয়ে ঈশ্বরদী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আব্দুল মমিন বলেন, ‘গত কয়েক দিনের প্রবল বর্ষণের কারণে দেশের বিভিন্ন স্থানে বন্যা ও জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। এতে সবজির মাঠ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং সরবরাহ ব্যবস্থাও ব্যাহত হয়েছে। এর প্রভাব বাজারে পড়েছে। উৎপাদন স্বাভাবিক হলে এবং সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতি ঘটলে দামও ধীরে ধীরে স্বাভাবিক পর্যায়ে চলে আসবে।’
স্থানীয় ব্যবসায়ীদের ধারণা, আবহাওয়ার উন্নতি এবং বাজারে সরবরাহ স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত কাঁচামরিচ ও অন্যান্য সবজির দাম সহসাই কমার সম্ভাবনা নেই। ফলে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের ওপর নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির চাপ আরও বাড়তে পারে।
