ঢাকামঙ্গলবার , ১৩ মে ২০২৫
আজকের সর্বশেষ সবখবর

পাঠক নেই, পত্রিকা নেই—তবু কোটি কপির হিসাব! ডিএফপির পরিসংখ্যান ঘিরে উঠছে নানারকম প্রশ্ন

জুবায়ের খান প্রিন্স , পাবনা:
মে ১৩, ২০২৫ ১২:৪৬ অপরাহ্ণ
Link Copied!

শেয়ার করুন...

ছাপা পত্রিকার পাঠকসংখ্যা কমছে, বিক্রি ধসে পড়ছে, বহু পত্রিকা ছাপা হয় না নিয়মিত। অথচ সরকার বলছে, প্রতিদিন ছাপা হয় ২ কোটি কপি! কোথা থেকে নির্ধারিত এ সংখ্যা? কারা পড়ে এসব পত্রিকা?

বাংলাদেশে ছাপা পত্রিকার বিক্রি ও পাঠকসংখ্যা গত এক দশকে অব্যাহতভাবে কমেছে। বিশেষ করে ডিজিটাল মিডিয়ার উত্থান, রাজনৈতিক একঘেয়েমি, সরকারি প্রভাব ও কোভিড-১৯–পরবর্তী অর্থনৈতিক সংকট—সব মিলিয়ে ছাপা সংবাদপত্র শিল্প গভীর সংকটে পড়েছে।

কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে সরকারের চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা অধিদপ্তর (ডিএফপি) দাবি করছে, দেশে প্রতিদিন ১ কোটি ৮৫ লাখ কপির বেশি পত্রিকা ছাপা হচ্ছে! ডিএফপি তালিকার বাইরেও বেশ কিছু পত্রিকা ছাপা হয় ঢাকা সহ সারাদেশে। অথচ বাস্তবতা বলছে ভিন্ন কথা।

এক দশকে ধস: পাঠক হারানোর রাজনৈতিক ও প্রযুক্তিগত পটভূমি

২০১৪ সালের পর থেকে দেশের অনেক দৈনিক পত্রিকা রাজনৈতিক কারণে পাঠক হারাতে থাকে। একই ধরণের দলীয় প্রচার, স্বাধীন সাংবাদিকতার অভাব এবং মতপ্রকাশের সংকোচনের কারণে অনেক পাঠক মুখ ফিরিয়ে নেয়। সাংবাদিকেরাও নিজস্ব তাগিদে সংবাদ সংগ্রহ, স্বাধীন ও সাহসী অনুসন্ধান, দূরদর্শী বিশ্লেষণ, পর্যাপ্ত তথ্য সমৃদ্ধ, প্রতিটা পত্রিকার প্রতিটা সাংবাদিকের নিজস্ব ভঙ্গিমায় সংবাদ লেখার প্রবণতা হারিয়ে ফেলছে। সহজে পাওয়া সহনশীল সংবাদ আর লেখা কপি করে চালিয়ে দেয়ার ভয়াবহ প্রবনতা বিবেকের অবক্ষয় ও মানসিক রোগের প্রবাহ বাড়ছে।
অন্যদিকে প্রযুক্তি ও স্মার্টফোনের বিস্তারে অনলাইন সংবাদমাধ্যম সহজলভ্য হয়ে ওঠে, যেখানে সংবাদ পাওয়া যায় তড়িৎগতিতে এবং বিনামূল্যে। এতে করে পাঠক ছাপা পত্রিকা বাদ দিয়ে মোবাইল ও সোশ্যাল মিডিয়াকেই প্রাধান্য দিতে শুরু করে।

করোনায় দ্বিতীয় ধাক্কা

২০২০ সালের কোভিড-১৯ মহামারি পরিস্থিতি পত্রিকা শিল্পকে দ্বিতীয়বারের মতো বড় ধাক্কা দেয়। অনেক পত্রিকা ছাপা বন্ধ করে দেয়। হকারদের কার্যক্রমও স্থবির হয়ে পড়ে। এরপর ধীরে ধীরে পত্রিকা আবার প্রকাশিত হলেও পূর্বের বিক্রি আর ফেরত আসেনি।

২০২৪ সালের আন্দোলন: ক্ষণিকের পুনর্জাগরণ

২০২৪ সালের গণ-আন্দোলন ও সরকারের পতনের সময় স্বল্পমেয়াদে কিছু পত্রিকার বিক্রি বেড়ে যায়। কিন্তু সেই বিক্রি স্থায়ী হয়নি। অধিকাংশ পত্রিকা পুরনো ধারা ও নিরুত্তাপ সাংবাদিকতায় ফিরে গেলে পাঠক আবার আগ্রহ হারায়।

সরকারি ‘কোটিপতি’ সংখ্যা: বাস্তবতা থেকে বহু দূরে

ডিএফপির তথ্যমতে, ২০২৩ সালের আগস্টে বাংলা ও ইংরেজি মিলিয়ে ঢাকা থেকে প্রকাশিত ২৮৪টি দৈনিক পত্রিকা মিলিয়ে ১ কোটি ৫৩ লাখ ৮৬ হাজার কপি ছাপা হয়েছে।
কিন্তু অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ঢাকায় সংবাদপত্র বিলির প্রধান দুই হকার সংগঠন মাত্র ৫৪টি পত্রিকা বিলি করে, যার মোট কপির সংখ্যা দৈনিক সোয়া চার লাখের মতো।

প্রশ্ন উঠছে: বাকি দেড় কোটির বেশি কপি কোথায় যায়? কারা পড়ে? কোথায় বিলি হয়? ছাপাই বা হয় কোথায়?

‘দেয়াল পত্রিকা’ ও ‘আন্ডারগ্রাউন্ড পত্রিকার’ কারসাজি

অনেক পত্রিকা ছাপা হয় শুধু সরকারি বিজ্ঞাপন পেলে। কাগজে ছাপা হলেও সেগুলোর কোনো জনপাঠক নেই। এমনকি সেগুলো সাধারণ বিক্রয় কেন্দ্রে পাওয়া যায় না। বরং পৌঁছে দেওয়া হয় শুধু সেই অফিস বা ব্যক্তির কাছে, যাদের নিয়ে সংবাদ বা বিজ্ঞাপন প্রকাশ হয়।
এসব পত্রিকা দেয়ালে আটকানো অবস্থায়ই বেশি দেখা যায়। পত্রিকা শিল্পে এগুলো পরিচিত ‘দেয়াল পত্রিকা’ ও ‘আন্ডারগ্রাউন্ড পত্রিকা’ নামে।

জালিয়াতির কারিগর: মিডিয়া তালিকাভুক্তি ও প্রচারসংখ্যা নির্ধারণে অনিয়ম

ডিএফপির তথ্যে থাকা অনেক পত্রিকার অস্তিত্ব নিয়েই প্রশ্ন রয়েছে। মিডিয়া তালিকাভুক্তি মানে সরকার স্বীকৃত হওয়া ও সরকারি বিজ্ঞাপন পাওয়ার যোগ্যতা অর্জন করা। কিন্তু প্রচারসংখ্যা নির্ধারণে অনেক সময়ই দেখা যায় মিথ্যা তথ্য দেওয়া হয়, যাতে বড় অঙ্কের বিজ্ঞাপন পাওয়া যায়।

এই চক্রে জড়িত ডিএফপির কিছু অসাধু কর্মকর্তা। রাজনৈতিক প্রভাবও কখনও কখনও এই জালিয়াতিকে প্রশ্রয় দেয়। ফলে বাস্তবে নিয়মিত না ছাপলেও কাগজে ছাপা হয় “কোটি কপি”র গল্প।

নোয়াবের উদ্বেগ ও বাধাসমূহ

নিউজপেপার ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সভাপতি এ কে আজাদ বলেছেন, “সংবাদপত্র শিল্প এখন নানা হুমকির মুখোমুখি। আয় কমছে, খরচ বাড়ছে। শুল্ক, ভ্যাট ও করপোরেট কর শিল্পের বিকাশে বড় বাধা।”
তিনি বলেন, “এই বাস্তবতা অনুধাবন না করলে পত্রিকার ভবিষ্যৎ অন্ধকার।”

সমাধানের পথ কী?

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সত্যিকার পাঠক ফেরাতে হলে প্রয়োজন:

পত্রিকার উপস্থাপনায় মৌলিকত্ব ও বৈচিত্র্য

অনুসন্ধানী ও দায়বদ্ধ সাংবাদিকতা

তরুণ প্রজন্মের উপযোগী কনটেন্ট ও ডিজিটাল অভিযোজন

প্রচারসংখ্যা নির্ধারণ ও মিডিয়া তালিকাভুক্তিতে জবাবদিহিতা

বিজ্ঞাপন বণ্টনে স্বচ্ছতা

সাংবাদিকদের পর্যাপ্ত ও বাস্তবসম্মত সম্মানী প্রদান

শেষ কথা

পাঠক হারানো, ছাপা না হওয়া, হকারদের বাস্তব বিক্রি এবং জাল প্রচারসংখ্যার গল্প—সব মিলিয়ে একটি গভীর সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে দেশের সংবাদপত্র শিল্প। এই সংকট শুধু একটি মাধ্যমের নয়, গণতন্ত্র ও মতপ্রকাশের অধিকার রক্ষার জন্যও তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।


শেয়ার করুন...

বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।
error: Content is protected !!