পাবনার আটঘরিয়া উপজেলা জুড়ে এখন চলছে খড় শুকানোর মহোৎসব। উপজেলার গ্রামাঞ্চলের কাঁচা-পাকা সড়ক থেকে শুরু করে গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক সড়ক পর্যন্ত প্রায় সর্বত্রই দেখা মিলছে রাস্তার ওপর খড় শুকানোর দৃশ্য। শুধু খড় শুকানোই নয়, অনেক স্থানে রাস্তার একাংশজুড়ে খড়ের বড় বড় পালা (গাদা) করে দীর্ঘদিন ধরে সংরক্ষণ করতেও দেখা যাচ্ছে। এতে একদিকে যেমন সাধারণ মানুষের চলাচলে বিঘ্ন ঘটছে, অন্যদিকে বাড়ছে সড়ক দুর্ঘটনার আশঙ্কাও।
বিশেষ করে দেবোত্তর থেকে একদন্ত মিনি বিশ্বরোড পর্যন্ত সড়কের বিভিন্ন অংশে এ চিত্র সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ছে। এছাড়া উপজেলার পাঁচটি ইউনিয়ন—দেবোত্তর, একদন্ত, চাঁদভা, মাজপাড়া ও লক্ষ্মীপুর ইউনিয়নসহ আটঘরিয়া পৌরসভার বিভিন্ন এলাকাতেও একই পরিস্থিতি বিরাজ করছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, উপজেলার বিভিন্ন সড়কে খড় শুকানোর দৃশ্য থাকলেও ডাঙ্গারগ্রাম থেকে ডাঙ্গারগ্রাম মাজার সড়কে এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি। সড়কের ওপর খড় ছড়িয়ে শুকানোর পাশাপাশি অনেক জায়গায় বড় বড় খড়ের পালা তৈরি করে রাখা হয়েছে। এতে রাস্তার একটি বড় অংশ দখল হয়ে যাচ্ছে এবং যানবাহন চলাচলে সৃষ্টি হচ্ছে বিঘ্ন। মোটরসাইকেল, অটোরিকশা, ভ্যান ও ইজিবাইককে ধীরগতিতে চলাচল করতে দেখা গেছে। দুই পাশ থেকে যানবাহন এলে চালকদের বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করতে হচ্ছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, সড়কটিতে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ মোড় রয়েছে। এছাড়া একটি সংকীর্ণ ব্রিজ থাকায় দুই দিক থেকে যানবাহন চলাচলের সময় প্রায়ই জটিলতা তৈরি হয়। দুর্ঘটনা প্রতিরোধে এলাকাবাসী চোরাস্তার মোড়ে নিজ উদ্যোগে একটি স্পিড ব্রেকার নির্মাণ করেছেন। তবে সড়কের ওপর খড় শুকানো ও খড়ের গাদা করে রাখার কারণে ঝুঁকি কমছে না। বিশেষ করে সন্ধ্যা ও রাতের বেলায় খড়ের গাদা, ঝুঁকিপূর্ণ মোড়, চোরাস্তার সংযোগস্থল এবং সংকীর্ণ ব্রিজটি পথচারী ও যানবাহন চালকদের জন্য বড় ধরনের উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ইতোমধ্যে রাস্তার ওপর ছড়িয়ে রাখা খড়ের কারণে দুর্ঘটনার ঘটনাও ঘটেছে বলে জানা গেছে। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, খড়ের ওপর মোটরসাইকেল পিছলে পড়ে এক যুবকের পায়ের বৃদ্ধাঙ্গুলির হাড় ভেঙে যায়। পরে চিকিৎসকের পরামর্শে এক্স-রে করলে আঘাতের বিষয়টি নিশ্চিত হয়। বর্তমানে তিনি চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, ধান কাটার মৌসুম শেষে গবাদিপশুর খাদ্য হিসেবে সংরক্ষণের জন্য খড় শুকানো হয়। পর্যাপ্ত খোলা জায়গা না থাকায় অনেক কৃষক বাধ্য হয়ে সড়ককেই শুকানোর স্থান হিসেবে ব্যবহার করছেন। তবে বর্তমানে এর পরিমাণ এতটাই বেড়েছে যে অনেক এলাকায় এটি জনদুর্ভোগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ডাঙ্গারগ্রামের এক বাসিন্দা বলেন,“গ্রাম থেকে মাজারের রাস্তা পর্যন্ত প্রায় সর্বত্র খড় শুকানো হচ্ছে। আবার শুকানোর পর রাস্তার পাশ ও ওপরেই বড় বড় পালা করে রাখা হচ্ছে। এতে রাস্তা সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে এবং সাধারণ মানুষের চলাচলে সমস্যা হচ্ছে।”
এক মোটরসাইকেল চালক বলেন,“দিনের বেলায় কোনোমতে চলাচল করা গেলেও রাতে অনেক ঝুঁকি থাকে। খড়ের গাদা দূর থেকে বোঝা যায় না। ফলে দুর্ঘটনার আশঙ্কা সবসময় থাকে।”
স্থানীয় ব্যবসায়ীরাও বলছেন, রাস্তার ওপর খড় ছড়িয়ে রাখা ও গাদা করে সংরক্ষণের কারণে যানবাহনের গতি কমে যাচ্ছে। এতে যাত্রী ও চালক উভয়কেই ভোগান্তির শিকার হতে হচ্ছে।
অন্যদিকে কৃষকদের দাবি, গরু-মহিষের প্রধান খাদ্য হিসেবে খড় সংরক্ষণ অত্যন্ত জরুরি। পর্যাপ্ত খোলা জায়গার অভাবে তারা বাধ্য হয়েই রাস্তার অংশ ব্যবহার করছেন।
সচেতন মহলের মতে, কৃষকদের প্রয়োজনীয়তা বিবেচনায় রেখে ইউনিয়ন পরিষদ ও স্থানীয় প্রশাসনের উদ্যোগে নির্দিষ্ট খোলা স্থান নির্ধারণ করা যেতে পারে। এতে কৃষকরা সহজে খড় শুকাতে ও সংরক্ষণ করতে পারবেন, আবার সড়কও থাকবে নিরাপদ।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, প্রতিবছর ধান কাটার মৌসুমে এই সমস্যা দেখা দিলেও কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয় না। ফলে বছরের পর বছর একই চিত্রের পুনরাবৃত্তি ঘটছে। কৃষকের প্রয়োজন ও জনসাধারণের নিরাপত্তার মধ্যে সমন্বয় এনে দ্রুত সমাধান করা না গেলে যেকোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।
